ইতিহাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইতিহাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ৮ জুন, ২০২০

গুপ্ত সম্রাট সমুদ্র গুপ্তের জীবনী, শাসন, রাজ্য জয় ও গুরুত্ব কি কি ?.


 ভারতে গুপ্ত সম্রাটদের মধ্যে প্রধান ও শ্রেষ্ঠ গুপ্ত শাসক হলেন সমুদ্র গুপ্ত । শুধু গুপ্ত বংশেরই নন, তিনি ছিলেন ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক শাসক । সমুদ্রগুপ্ত ছিলেন গুপ্তসম্রাট প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ও লিচ্ছবি রাজকন্যা কুমারদেবীর সন্তান । সমুদ্র গুপ্ত সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানা যায় কিছু ঐতিহাসিক উপাদানের সাহায্যে । আর্য-মঞ্জুশ্রী মুলকল্প ও তন্ত্রি-কামান্ডকে তাঁর উল্লেখ পাওয়া যায় । এছাড়া সমুদ্রগুপ্তের মুদ্রা থেকে তার রাজত্বের বহু তথ্য জানা যায় । সমুদ্র গুপ্তের পাঁচটি বিভিন্ন ধরনের মুদ্রা পাওয়া গেছে । প্রথম মুদ্রাতে তিনি তীর ধনুক সহ দণ্ডায়মান, দ্বিতীয়টিতে তাঁর হাতে একটি কুঠার, পরেরটিতে তাঁর পদদলিত একটি বাঘ, এর পরেরটিতে তিনি বীণা বাদনরত, শেষ মুদ্রাটিতে অশ্বমেধের স্মারক হিসাবে তাঁকে দেখা যায় ।




 এই মুদ্রাগুলির সাহায্যে তাঁর সর্বতোমুখী প্রতিভার কথা বলা হয়েছে । সমুদ্র গুপ্তের জন্য দুটি লেখ মূল্যবান, সেগুলি হল – মধ্য প্রদেশে এরাণ লেখ ও এলাহাবাদে হরিষেণ প্রশস্তি । হরিষেণ প্রশস্তি অশোক স্তম্ভের উপর রচিত । সমুদ্রগুপ্তের সভাকবি হরিষেণ রচিত এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে তার ও তার রাজ্যজয় ও রাজত্বকাল সম্পর্কে বহু তথ্য জানা যায় । সমগ্র গুপ্ত যুগের ইতিহাস জানার জন্য এই লেখাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । হরিষেণ প্রশস্তির সপ্তম স্তবক থেকে সমুদ্র গুপ্তের সামরিক সাফল্যের বর্ণনা পাওয়া যায় ।


 সমুদ্র গুপ্ত কবে সিংহাসন আরোহণ করেছিলেম. । তার সিংহাসনারোহণের বছর কোনটি – এই প্রশ্নে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে । ড. রায়চৌধুরি ৩২৫ খৃষ্টাব্দকে সমুদ্র গুপ্তের সিংহাসন লাভের তারিখ বলেছেন । আবার ড. মজুমদার মনে করেন- ৩৫০ খৃষ্টাব্দ বা তাঁর কাছাকাছি সময়ের আগে সমুদ্র গুপ্ত সিংহাসন লাভ করেননি । ডক্টর আর কে মুখোপাধ্যায়ের মতে, সমুদ্রগুপ্ত ৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেন ।

 তার রাজ্যজয়ের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে । এলাহাবাদ প্রশস্তির দশম থেকে দ্বাদশ স্তবক পর্যন্ত সমুদ্রগুপ্তের বিভিন্ন রাজ্য বিজয়ের সংবাদ পাওয়া যায় । সমুদ্র গুপ্ত অচ্যুত, নাগসেন, গণপতি নাগ ও কোটা পরিবারের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন । এরপর তিনি বাকাটকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন । অনুমান করা হয় যে এই যুদ্ধ মধ্যপ্রদেশের এরাণে হয়েছিল । তিনি এখানে যুদ্ধ জয়ের স্মারক হিসাবে একটি শিব মন্দির স্থাপন করেন । তিনি মহা ক্ষত্রপ তৃতীয় রুদ্র সেন কে পরাজিত করেছিলেন । এরপর তিনি গঙ্গা ও দোয়াব অঞ্চলের সমভূমির উপর তাঁর অধিকার সুদৃঢ় করেন । দক্ষিণ ভারতের বারো জন রাজা তাঁর গ্রহণ-মোক্ষ-অনুগ্রহ নীতি গ্রহণ করেন ।

 সমুদ্র গুপ্ত উত্তর ভারতের নয়জন রাজাকে পরাজিত করে তাঁদের সাম্রাজ্য তিনি নিজের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন । তিনি ভারতের রাজনৈতিক ঐক্য সাধন করে নিজেকে ‘একরাট’ রূপে প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে ভিন্ন নীতি গ্রহণ করেন । উত্তর ভারতের বিজিত রাজ্যগুলি তিনি সরাসরি তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন । কিন্তু, দক্ষিণ ভারতে তিনি গ্রহণ-মোক্ষ-অনুগ্রহ নীতি গ্রহণ করেন । পাটলিপুত্র থেকে দাক্ষিণাত্যে শাসন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না । এর থেকে তাঁর রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায় । এই নয় জন রাজার পরিচয় থেকে বলা যায় – উত্তর প্রদেশের অধিকাংশ, মধ্যপ্রদেশের বিশেষ অংশ ও বঙ্গ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল ।

 আর্যাবর্ত জয়ের পর সমুদ্র গুপ্ত আটবিক রাজ্যগুলি জয় করেন । তাঁর দক্ষিণাপথ অভিযানের পথ সুগম করেন । তিনি উত্তর-পূর্ব ভারতের পাঁচটি সীমান্ত রাজ্য জয় করেন । সেগুলি হল – সমতট, কামরূপ, নেপাল, দবক ও কর্তৃপুরা । তিনি উপজাতি রাজ্যগুলি জয় করে নিজে গ্রাস না করে তাদের প্রতি উদারতা প্রদর্শন করেন । পশ্চিমের নাগগণ ছিলেন আর্যাবর্তের গুপ্তদের প্রবলতম প্রতিদ্বন্দ্বী । আবার নাগদের সাথে সেই সময় বাকাটকদের মৈত্রীর সম্পর্ক ছিল ।

 সমুদ্র গুপ্ত দক্ষিণ ভারত অভিযানের মাধ্যমে তাঁর সাম্রাজ্যের সীমা সম্প্রসারিত করেননি । পল্লব সেনা বাহিনী ধ্বংস করা এই অভিযানের মূল লক্ষ ছিল । এই অঞ্চলের অপরিমিত সম্পদ তাঁকে প্রলুব্ধ করেছিল । মনে করা হয় যে – তিনি একবার দক্ষিণ ভারত অভিযান করেন । যদিও, এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি । দক্ষিণ ভারতের রাজাদের সবাইকে কর দিতে হত । সেই করের সাহায্যে গুপ্ত সম্রাটগণ একটি আড়ম্বরপূর্ণ, মার্জিত রাজসভা, একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করেছিলেন ।
  সমুদ্র গুপ্ত আর্যাবর্তের রাজ্য গুলি জয় করে দুর্গম দাক্ষিণাত্যে অভিযান পরিচালনা করে তাঁর সামরিক প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন । উত্তর ভারতের বিরাট অংশ তিনি প্রত্যক্ষ শাসন করেছেন । শুধুমাত্র দক্ষিণ দিক বাদ দিয়ে বাকি তিন দিক এই অঞ্চলকে কয়েকটি করদ রাজ্য দিয়ে ঘিরে রেখেছিলেন ।

 সমুদ্র গুপ্তের রাজত্বের সূচনা সম্পর্কে মতভেদ থাকলেও তাঁর শাসনের সমাপ্তি বিষয়ে ততটা মতভেদ নেই । পরবর্তী সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্র গুপ্তের প্রথম লেখ ৩৮০ খ্রিষ্টাব্দে মথুরায় পাওয়া গেছে । এর থেকে জানা যায় যে – ৩৭৫-৩৭৬ খ্রিস্টাব্দে সমুদ্র গুপ্তের রাজত্ব শেষ হয়েছিল । তিনি শুধু যোদ্ধা বা রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি মানবিক গুনের অধিকারী ছিলেন । তিনি বিদ্বান ও বিদ্যোৎসাহী ছিলেন । শাস্ত্রতত্ত্বে পারদর্শী ছিলেন, তিনি বহু কবিতা রচনা করেন ।

 আবার তিনি সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন । তাঁর বিনা বাদনরত মুদ্রায় প্রমাণ পাওয়া যায় । তার বীণা বাদনরত মূর্তি দেখে অনুমিত হয় যে তিনি ছিলেন সংগীত রসিক । ব্রাহ্মণ্য ধর্মের গৌরব পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয় সমুদ্র গুপ্তের আমলে । অনেকে আবার তাঁকে সম্রাট অশোকের সাথে তুলনা করেছেন । শিল্প মণ্ডিত সুবর্ণ মুদ্রা গুপ্ত যুগের গৌরব । তিনি সাধারণত ‘পরাক্রম’ উপাধি ও তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে বিক্রম অভিধা গ্রহণ করেন । ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষক হলেও সমুদ্রগুপ্ত ছিলেন পরমতসহিষ্ণু । সমুদ্র গুপ্ত হিন্দু রাজচক্রবর্তী আদর্শের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধ জয়ের শেষে তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেছিলেন । এই যজ্ঞানুষ্ঠানের স্মৃতিকে রক্ষা করার জন্য তিনি ‘অশ্বমেধ পরাক্রম’ এই দুটি শব্দ দিয়ে বিশেষ মুদ্রা প্রচলন করেন ।
 

গুপ্ত পূর্ব যুগে ও গুপ্ত যুগের প্রথম দিকে ভারতের সাথে সিংহলের ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্য বিশেষ বৃদ্ধি পেয়েছিল । ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য সিংহল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল । উত্তর ভারতের বৃহত্তম বন্দর তাম্রলিপ্তের সঙ্গে সিংহলের বিশেষ বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল । ভারতের মসলিন চীনে বিশেষ পরিচিত ছিল । চীনের রেশম ভারতীয়দের কাছে বিশেষ কদর ছিল । এই বাণিজ্য সমুদ্র গুপ্তের বৈদেশিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছিল ।

 আমাদের লেখা আপনার কেমন লাগছে বা আপনার যদি কোন প্রশ্ন থাকে তবে নিচে কমেন্ট করে জানান । আপনার বন্ধুদের কাছে পোস্ট টি পৌঁছেদিতে অনুগ্রহ করে শেয়ার করুণ । ইতিহাস বিষয়ে আরও পোস্ট পড়তে নিচে ইতিহাস লেখাটির উপর ক্লিক করুণ । পুরো পোস্ট টি পড়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ।
আপনারা দয়া করে এখানে থাকা বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের উপর ক্লিক করে আপনার প্রয়োজন অনুসারে জিনিস কিনুন, তাহলে আমি কিছু কমিশন পাব।

মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের জীবনী, শাসন, সাম্রাজ্য ব্যবস্থা কেমন ছিল ?.


  খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর শেষদিকে মৌর্যদের আবির্ভাবের সাথে ভারতের ইতিহাসে অন্ধকার পার হয়ে আলোয় উত্তীর্ণ হয় । চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩২৪-৩০০) ছিলেন মৌর্য বংশের প্রথম সম্রাট । পূর্বে নন্দ রাজাগণ বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হন । সেই সময় সাম্রাজ্য সঠিক ভাবে চালানোর গুরু দায়িত্ব পালনের জন্য ভারতের ইতিহাসে একজন বীরপুরুষের প্রয়োজন ছিল । এই যুগ সন্ধিক্ষণে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে সিংহাসনে আরোহণ করে বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল । চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সিংহাসনে আরোহণের সঠিক তারিখ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে ।

 জৈন পরিশিষ্ট পার্বণ অনুসারে – তিনি মহাবীরের সিদ্ধিলাভের ১৫৫ বছর পরে সিংহাসন আরোহণ করেন । অপর জৈন লেখক মেরু তুঙ্গের মতে – তিনি মহাবীরের সিদ্ধিলাভের ৬০ বছর পরে সিংহাসন আরোহণ করেন । এর থেকে বোঝা যায় যে এইসব উপাদান নির্ভরযোগ্য নয় । প্রাচীন গ্রীক ও ল্যাটিন লেখকদের থেকে জানা যায় যে – তিনি খ্রিস্টপূর্ব ৩২৪ অব্দ নাগাদ সিংহাসন আরোহণ করেন ।
 চন্দ্রগুপ্তের পূর্বপুরুষ ও কৈশোর সম্বন্ধে খুব কম তথ্যই পাওয়া যায় ।  চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বংশ পরিচয় সম্পর্কে বিভিন্ন মতভেদ আছে । মৌর্য শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে আবার সকলে একমত নয় । মনে করা হয় যে – এই মুরা ছিলেন কোন শূদ্র বংশীয় ও কোন নন্দ রাজার পত্নী । পুরাণে মুরা নামের কোন উল্লেখ নেই । মৌর্যদের সাথে তাঁদের কোন পারিবারিক সম্পর্কের কথা জানা যায় না । তাই এই মতামত সমর্থন যোগ্য নয় । ঐতিহাসিক জাস্টিন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে সামান্য বংশজাত বলেছেন । বৌদ্ধ লেখক গন মৌর্য শব্দটি একটি সামান্য গোষ্ঠীর নাম হিসাবে ব্যবহার করেছেন । মহাবংশটীকা অনুসারে, তাকে শাক্য ক্ষত্রিয় গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বর্ণনা করা হয়েছে । বৌদ্ধ গ্রন্থ মহাবংশে চন্দ্রগুপ্তকে মোরিয় নামক একটি ক্ষত্রিয় গোষ্ঠীর সন্তান বলে উল্লেখ করা হয়েছে । 
 চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সম্বন্ধে জানতে আমরা বিভিন্ন ঐতিহাসিক উপাদানের সাহায্য নিয়ে থাকি । সে গুলি হল – সাহিত্য উপাদান, অশোকের লেখ, মহীশূর লেখ, জুনাগড় স্তম্ভ লেখবিদেশি সাহিত্যিকদের মধ্যে – নিয়ারকাস, ওনেসিক্রিটাস ও এরিসটোবুলাসের লেখা থেকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সম্বন্ধে জানা যায় । মেগাস্থিনিসের ‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থ থেকে আমারা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সম্বন্ধে অনেক তথ্য জানতে পারি । মেগাস্থিনিসের মূল গ্রন্থ ‘ইন্ডিকা’ পাওয়া যায়নি । এছাড়াও স্ট্রাবো, প্লিনি, ডায়ডোরাস, অ্যারিয়ান ও জাস্টিনের নাম উল্লেখযোগ্য । বিদেশি সাহিত্য ছাড়া ভারতীয় বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্য থেকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সম্বন্ধে অনেক তথ্য পাওয়া যায় ।
 বৌদ্ধ সাহিত্য অনুসারে - চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পিতা একজন মোরিয় গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন । সীমান্ত সংঘর্ষে তাঁর মৃত্যু হয় । তখন তাঁর স্ত্রী অসহায় অবস্থায় পাটলিপুত্রে চলে আসেন । এখানে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের জন্ম হয় । চাণক্য বা কৌটিল্যের সাহায্যে তিনি তক্ষশীলায় গিয়ে শিক্ষালাভ করেন । দুইজনে মিলে নন্দ সম্রাট ধননন্দকে সিংহাসনচ্যুত করার পরিকল্পনা করেন । তিনি আলেকজান্ডারের কাছে নন্দ বংশ উচ্ছেদ করার জন্য সাহায্য প্রার্থনা করেন । কিন্তু, আলেকজান্ডার তাঁকে সাহায্য না করে চন্দ্রগুপ্তকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন । চন্দ্রগুপ্ত সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে বনাঞ্চল ও অন্যান্য স্থান থেকে লোকজন সংগ্রহ করে একটি সুশিক্ষিত সেনাবাহিনী গঠন করেন । জৈন পরিশিষ্ট পার্বণ অনুসারে - চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নন্দবংশ উচ্ছেদ করার জন্য তাঁর সৈন্যদল গঠন করেছিলেন ।
 চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কিভাবে নন্দবংশ উচ্ছেদ করেছিলেন সমসাময়িক বিবরণ থেকে তাঁর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না । পাটলিপুত্র নগরী অবরোধ করে ৩২১ খ্রিটপূর্বাব্দে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে নন্দ সাম্রাজ্য অধিকার করেন বলে জানা যায় । উত্তর-পশ্চিম ভারতে আলেকজান্ডারের সেনাপতিদের পরাজিত করে পাঞ্জাব ও সিন্ধুর স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করা চন্দ্রগুপ্তের দ্বিতীয় সাফল্য । চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজত্বকালের শেষ দিকে সেলুকাসের সাথে তাঁর যুদ্ধ হয় । সেলুকাস প্রথমে আলেকজান্ডারে সেনাপতি ছিলেন । উভয়ের মধ্যে সন্ধি ও বিবাহ সম্পর্কিত চুক্তির মাধ্যমে এই যুদ্ধ সমাপ্ত হয় । চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সেলুকাসকে ৫০০ হাতি উপহার দেন । সেলুকাস চন্দ্রগুপ্তকে হেরাত, কান্দাহার, কাবুল ও দক্ষিণ বেলুচিস্তান হস্তান্তরিত করেন । সেলুকাস মেগাস্থিনিস কে পাটলিপুত্রে দূত হিসাবে পাঠান । যুদ্ধের শেষে বিবাহ সম্পর্কিত চুক্তি ও অঞ্চল গুলি হস্তান্তর সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে । চন্দ্রগুপ্ত ও সেলুকাসের মধ্যে প্রকৃত বিবাহ চুক্তি হয়েছিল কিনা তা সঠিক ভাবে বলা যায় না ।
 চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য জৈন ঐতিহ্য অনুসারে শেষ জীবনে সংসার ত্যাগ করেন । জৈন আচার্য্য ভদ্রবাহুর নিকট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য আধ্যাত্মিক শিক্ষা লাভ করেন, ভদ্র বাহুর নেতৃত্বে তিনি জৈন অভিপ্রায়ে অংশ নিয়ে মহীশূরের শ্রাবণ জেলায় আসেন । সে সময়ের প্রচলিত জৈন রীতি অনুসারে অনশনে তিনি প্রাণ ত্যাগ (খ্রিস্টপূর্ব-৩০০) করেন । মেগাস্থিনিসের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে – তিনি গোঁড়া ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন । অন্যান্য সম্রাটদের মত তিনি পূজা বেদীতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন ।
 চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসন ব্যবস্থা জানার জন্য আমরা প্রধানত মেগাস্থিনিসের ‘ইন্ডিকা’ ও কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র এর উপর নির্ভর করি । এছাড়াও অশোকের লেখ, জুনাগড় শিলালেখ, মুদ্রারাক্ষস, বৌদ্ধ ও জৈন গ্রন্থের গুরুত্ব রয়েছে । পাটলিপুত্র নগরীর রাজপ্রাসাদ গ্রীকদের প্রশংসা অর্জন করেছিল । এই প্রাসাদটি ছিল কাঠ দিয়ে তৈরি । চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এই প্রাসাদের অভ্যন্তরে রণরঙ্গিণী নারী দেহরক্ষী পরিবৃত হয়ে বিলাসী জীবন যাপন করতেন । মেগাস্থিনিস গঙ্গা ও শোন নদীর সংগম স্থলে অবস্থিত পাটলিপুত্রকে ভারতের বৃহত্তম নগর বলে উল্লেখ করেছেন । সমুদ্র বা নদীর তীরে অবস্থিত শহর গুলি কাঠের তৈরি, ও দূরবর্তী স্থানে অবস্থিত শহর গুলি ইটের তৈরি ছিল ।
 চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য প্রাদেশিক শাসনের উপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করার বিশেষ ব্যবস্থা করেন । চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সময় প্রদেশগুলির সংখ্যা কত ছিল, সঠিক জানা যায় না । অশোকের সময় মৌর্য সাম্রাজ্য - উত্তরাপথ, অবন্তীপথ, দক্ষিণাপথ, কলিঙ্গ ও প্রাচ্য এই পাঁচটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল । শাসন ক্ষমতায় তিনি সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত ছিলেন । শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করার জন্য রাজার একটি ছোট উপদেষ্টা ছিল । এরা রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজাকে সাহায্য করতেন । তাঁরা প্রাদেশিক শাসন কর্তা, সেনাপতি, বিচারক, কোষাধ্যক্ষ, নৌবাহিনীর অধিনায়ক ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ রাজ কর্মচারীদের নির্বাচন করতেন । চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সময় কৃষি ও ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে ছিল । মেগাস্থিনিস ও কৌটিল্যের মতে – সামান্য অপরাধে অনেক জরিমানা আদায় করা হত । শাস্তি হিসাবে অঙ্গছেদ ও কারাবাসের ব্যবস্থা ছিল । ব্রাহ্মণদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত না । কিন্তু, রাজদ্রোহের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত ।
 বিচার ব্যবস্থার শীর্ষে রাজা নিজে থাকতেন । রাজকীয় বিচারালয় ছিল সবার উপরে । সেখানে রাজা নিজে বিচার করতেন । এছাড়াও শহর ও গ্রামাঞ্চলে দুই ধরনের বিচারালয় ছিল । শহরের বিচারালয়ে মহামাত্ররা বিচার করতেন । গ্রামাঞ্চলে বিচার করতেন রজুকগন । ‘গ্রামিক’ গ্রামের বৃদ্ধদের সাহায্যে ছোট ছোট মোকদ্দমার বিচার করতেন । শাসন ব্যবস্থায় সর্বনিম্ন ও ক্ষুদ্রতম একক ছিল গ্রাম । গ্রামবাসীরা নতুন দিঘী, নষ্ট পুকুর বা দিঘী পুনরুদ্ধার করলে তাঁদের কর মকুব করা হত । গ্রামের উদ্বৃত্ত জমি ‘গ্রামভৃতক’ দের সাহায্যে চাষ করা হত । ডঃ রায়চৌধুরির মতে – এরা ছিলেন গ্রামে নিযুক্ত সরকারের বেতনভুক কর্মচারী । আবার অনেকে এদেরকে গ্রামের ক্রীতদাস বলে থাকেন।

 আমাদের লেখা আপনার কেমন লাগছে বা আপনার যদি কোন প্রশ্ন থাকে তবে নিচে কমেন্ট করে জানান । আপনার বন্ধুদের কাছে পোস্ট টি পৌঁছেদিতে অনুগ্রহ করে শেয়ার করুণ । ইতিহাস বিষয়ে আরও পোস্ট পড়তে নিচে ইতিহাস লেখাটির উপর ক্লিক করুণ । পুরো পোস্ট টি পড়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ

আপনারা দয়া করে এখানে থাকা বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের উপর ক্লিক করে জিনিস কিনুন, তাহলে আমি কিছু কমিশন পাব।

শনিবার, ২ মে, ২০২০

ভারতের প্রথম প্রধান মন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর বাংলা জীবনী .


 পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ভারতীয় জাতীয়  কংগ্রেসের রাজনীতিবিদ, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন গঙ্গা নদীর তীরে এলাহাবাদ শহরে ১৪ই নভেম্বর, ১৮৮৯ সালে জওহরলাল নেহরু জন্মগ্রহণ করেন । তার পিতা মতিলাল নেহরু ও মা স্বরূপ রানি । মতিলাল নেহরু ছিলেন একজন বিখ্যাত আইন ব্যবসায়ী । আইন ব্যবসার কারণে মতিলাল নেহরু এলাহাবাদে বসবাস শুরু করেন । জওহরলাল ও তার দুই বোন ছিল বিজয়া লক্ষ্মী ও কৃষ্ণা । ভারতের সবথেকে আধুনিক স্কুলে পড়ার পর প্রায় ১৫ বছর বয়সে নেহরু ইংল্যান্ডের হ্যারোতে চলে যান । তিনি প্রকৃতি বিজ্ঞানের উপরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে লেখাপড়া করেন । এরপর তিনি কেমব্রিজেই ব্যারিস্টারি পড়া শুরু করেন ।
 তিনি দেশে ফেরেন ১৯১২ সালে । ভারতে ফিরে আসবার পরে তখন তার বয়স যখন ছিল ২৭ বছর । ১৯১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জওহরলাল নেহেরু কমলা কাউলকে বিয়ে করেন । কমলা কাউলের গর্ভে তাদের একমাত্র কন্যা ইন্দিরা প্রিয়দর্শীনির জন্ম হয় । নেহেরুর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী ও তার স্বামী ফিরোজ গান্ধী । ১৯৪৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র রাজীব গান্ধীর জন্ম হয় । পরবর্তীকালে তার মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী ও দৌহিত্র রাজীব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন । ১৯৩১ সালে নেহেরুর পিতা মতিলাল নেহেরুর মৃত্যু হয় ।

 ইংল্যান্ডে পড়ার সময় থেকেই নেহেরু ভারতীয় ছাত্র সংসদের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন । এই সময়েই তিনি সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন । তিনি নিজেকে একজন আইনজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন । সে সময় পিতার হাত ধরেই নেহেরু কংগ্রেসের রাজনীতিতে যোগ দেন । নেহেরু ভারতীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন । মহাত্মা গান্ধীর দর্শন ও নেতৃত্ব জওহরলাল নেহেরুকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে । গান্ধীর নীতি সত্যাগ্রহ ও অহিংসার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে চম্পারান আন্দোলনের সময় নেহেরু গান্ধীর সাথে পরিচিত হন এবং তাকে সাহায্য করেন । মহাত্মা গান্ধীর প্রভাবে নেহেরু পরিবার তাদের ভোগ-বিলাসের জীবন ত্যাগ করেন । তখন থেকে নেহেরু খাদির তৈরি কাপড় পড়তেন । একজন বিশিষ্ট সংগঠক হিসেবে নেহেরু উত্তর ভারতে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেন ।
 ১৯২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি চৌরিচৌরাতে বাইশজন পুলিশকে বিদ্রোহীরা হত্যা করে । গান্ধী ঐ সময় কারাগারে অনশন ধর্মঘট পালন করছিলেন । গান্ধী এহেন হিংসাত্মক ঘটনার প্রতিবাদে অনশন ত্যাগ করেন । এই ঘটনার পরে মতিলাল নেহেরু কংগ্রেস ছেড়ে চলে গেলেও নেহেরু গান্ধীর সাথে কংগ্রেসে থেকে যান । অসহযোগ আন্দোলনের সময়টাতে দু’বার কারাবরণও করেন নেহরু ১৯২০ সালে নেহেরু নিখিল ভারত শ্রমিক ইউনিয়ন কংগেসের সভাপতি নির্বাচিত হন । তিনি ১৯২৪ সালে এলাহাবাদ মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন । দুই বছর এই পদে আসীন থাকেন । ১৯২৯ সালের লাহোর সম্মেলনে গান্ধীর পরামর্শে নেহেরুকে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় । ১৯৩৬ সালে নেহেরু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং এর লক্ষ্মৌ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ।
 ১৯২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর কংগ্রেস সভাপতি নেহেরু রাভি নদীর তীরে এক জনসভায় ভারতের স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন । ১৯৩১ থেকে ১৯৩৫ সালের মাঝে মাত্র চার মাস ছাড়া বাকি সময় তিনি বোন ও স্ত্রীসহ কারাগারে ছিলেন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের ভাইসরয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে কোন রূপ আলোচনা ছাড়াই, ভারতের পক্ষে মিত্রশক্তির বিরূদ্ধে যুদ্ধে যোগদানের ঘোষণা করেন । যুদ্ধের পর ভারতীয়দের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা হবে এই আশায় নেহেরু ব্রিটিশদের সমর্থন দেন । কিন্তু ব্রিটিশ সরকার কংগ্রেস নেতাদের বিশ্বাস ভঙ্গ করলে গান্ধী ও বল্লভভাই প্যাটেল আন্দোলনের ডাক দেন । নেহেরু "ভারত ছাড়" আন্দোলনকে জনপ্রিয় করতে ভারতের বিভিন্ন স্থানে সফর করেন । ব্রিটিশ সরকার ১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট নেহেরু ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নেতাকে গ্রেফতার করে । ১৯৪৫ সালে তিনি জেল থেকে বের হন ।
 শুধু তিনি রাজনীতিবিদ নন, সমান ভাবে পরিচিত একজন কবি, সাহিত্যকার ও দেশপ্রেমী হিসেবে লেখক হিসেবে নেহরু ছিলেন বিশিষ্ট । শুধু ভারতীয় উপমহাদেশই নয়, বিশ্বপাঠকের কাছে তিনি একজন সমৃদ্ধ লেখক । ইংরেজীতে লেখা তাঁর তিনটি বিখ্যাত বই- 'একটি আত্মজীবনী'(An Autobiography), 'বিশ্ব ইতিহাসের কিছু চিত্র'(Glimpses of World History), এবং 'ভারত আবিষ্কার'(The Discovery of India) চিরায়ত সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করেছে । জওহরলাল নেহরু এর বই সমগ্র পড়লে তাঁর ব্যক্তিজীবনের দর্শন, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অনেকটাই জানতে পারা যায়
 শুধু মাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী বা রাজনৈতিক নেতা হিসেবেই নয়, একজন শিশুপ্রেমী হিসেবেও বিখ্যাত তিনি ভারতে 14ই নভেম্বর তাঁর জন্ম দিনটি পালিত হয় শিশুদের জন্যে পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে প্রতিবছর বেশ আনন্দের সঙ্গেই পালিত হয় এই দিনটি শিশুদের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা ছিল তাঁর । তাঁর এই ভালোবাসাই তাঁকে পরিচিতি দিয়েছে সবার প্রিয় চাচাজী হিসেবে
 নিখিল ভারত মুসলিম লীগ নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবি জানাচ্ছিলেন । অবশেষে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয় । ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ সালে নেহেরু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন । ২৭ মে, ১৯৬৪ পর্যন্ত তিনি ভারতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন । ১৯৬৪ সালের ২৭ মে নেহেরু মৃত্যুবরণ করেন ।

  আপনারা দয়া করে এখানে থাকা বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের উপর ক্লিক করে জিনিস কিনুন, তাহলে আমি কিছু কমিশন পাব।

বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২০

ভারতের জাতীর জনক মহাত্মা গান্ধীর বাংলা জীবনী .


 মহাত্মা গান্ধী একজন অন্যতম ভারতীয় রাজনীতিবিদ, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রগামী ব্যক্তিদের একজন এবং প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক নেতা ছিলেন ১৮৬৯ সালের ২রা অক্টোবর ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় গুজরাত প্রাদেশিক এলাকা পোর বন্দরে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর জন্ম গ্রহণ করেন । তার পিতা করমচাঁদ গান্ধী ও মা পুতলিবা করমচাঁদের চতুর্থ স্ত্রী ছিলেন । পুতলিবা প্রণামী বৈষ্ণব গোষ্ঠীর ছিলেন । তাঁর মা ছিলেন একজন অত্যন্ত ধার্মিক মহিলা, যিনি পুত্রের মধ্যে দৃঢ় হিন্দু নৈতিকতার সঞ্চার করেছিলেন । ধার্মিক মায়ের সাথে এবং গুজরাটের জৈন প্রভাবিত পরিবেশে থেকে গান্ধী ছোটবেলা থেকেই জীবের প্রতি অহিংসা, নিরামিষ ভোজন, আত্মশুদ্ধির জন্য উপবাসে থাকা, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সহিষ্ণুতা ইত্যাদি বিষয় শিখতে শুরু করেন । মানব হিতৈষী মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী সবার কাছে পরিচিত ছিলেন মহাত্মা এবং বাপু নামে । 

মহাত্মা গান্ধী তার ছোটবেলায় পোর বন্দর ও রাজকোটের  ছাত্র ছিলেন । গুজরাটের ভবনগরের সামালদাস কলেজ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হন । ১৮৮৩ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে মহাত্মা গান্ধী বাবা মায়ের পছন্দে কস্তুরবা মাখাঞ্জীকে বিয়ে করেন । তার পরিবারের ইচ্ছা ছিল তাকে  আইনজীবী করা । সে জন্য ১৮ বছর বয়সে ১৮৮৮ সালের ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে পড়তে যান । তিনি লন্ডনের গুটি কয়েক নিরামিষভোজী খাবারের দোকানের একটিতে নিয়মিত যেতেন ।

 লন্ডনে পড়তে যাবার আগে গান্ধী তার মা পুতলিবাই এবং চাচা বেচারজির কাছে প্রতিজ্ঞা করেন যে
, তিনি মাংস খাওয়া, মদ্যপান এবং নারী সঙ্গ থেকে বিরত থাকবেন । তিনি মাংস, মদ এবং উচ্ছৃঙ্খলতা ত্যাগ করার হিন্দু নৈতিক উপদেশ পালন করেন । গান্ধী এ সময় অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সঙ্গলাভ করেন এবং লন্ডন ভেজিটেরিয়ান সোসাইটির চেয়ারম্যান ড. জোসেফ ওল্ডফিল্ড এর বন্ধু হয়ে ওঠেন । গান্ধী হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, ইসলামসহ অন্যান্য ধর্ম এবং বিভিন্ন রীতি সম্পর্কে পড়াশোনা করেন । লন্ডন থেকে ফেরার পর গান্ধী নিরামিষ খাবার ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহিত করেন । গান্ধীর মতে, নিরামিষ শুধু শরীরের চাহিদাই মেটাবে না, এটি মাংসের প্রয়োজন মিটানোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যও পূরণ করবে, যা সবজি ও ফলের চেয়ে মূল্যবান ।

 একজন শিক্ষিত ব্রিটিশ আইনজীবী হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিপীড়িত ভারতীয় সম্প্রদায়ের নাগরিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে গান্ধী প্রথম তাঁর অহিংস শান্তিপূর্ণ নাগরিক আন্দোলনের মতাদর্শ প্রয়োগ করেন । গান্ধীজী একজন আইনজীবী হিসাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান । দক্ষিণ আফ্রিকা গান্ধীর জীবনকে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন করে দেয় । প্রথম শ্রেণীর বৈধ টিকিট থাকা সত্ত্বেও একটি ট্রেনের প্রথম শ্রেণীর কামরা থেকে তৃতীয় শ্রেণীর কামরায় তাকে নেমে যেতে বাধ্য করা হয় । এমন কি তাকে হোটেল থেকেও বহিষ্কার করা হয় । এখানে তিনি ভারতীয় ও কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হন । ১৮৯৪ সালে গান্ধী নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন । এই সংগঠনের মাধ্যমে সেখানকার ভারতীয়দেরকে রাজনৈতিক ভাবে সংঘবদ্ধ করেন । দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের ভোটাধিকার ছিল না । এই অধিকার আদায়ের বিল উত্থাপনের জন্য তিনি আরও কিছুদিন দেশটিতে থেকে যান ।
 ১৯১৫ সালের ৯ই জানুয়ারি গান্ধী ভারতে ফিরে আসেন এইজন্য ওই দিনটিকে প্রবাসী ভারতীয় দিবস হিসাবে পালন করা হয় । গান্ধী ভারতে প্রথম সাফল্য অর্জন করেন ১৯১৮ সালের চম্পারন বিক্ষোভ এবং খেদা সত্যাগ্রহের মাধ্যমে । সে সময় মারাত্মক দুর্ভিক্ষের মাঝে ব্রিটিশরা একটি শোষণমূলক কর চালু করেন এবং তা বাড়ানোর চেষ্টা করেন । এতে পরিস্থিতি প্রচণ্ড অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে । তিনি প্রতিবাদ করায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রদেশ ছেড়ে যেতে নির্দেশ দেয়া হয় । অন্যায়ের বিরুদ্ধে গান্ধীর অস্ত্র ছিল অসহযোগ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ । এই ঘটনার ফলে জেলের বাইরে হাজার হাজার লোক জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন । পুলিশ স্টেশন ও আদালতে এসে তারা গান্ধীর মুক্তি দাবি করতে থাকে । আদালত নীরবে মেনে নিয়ে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন  । গান্ধী জমিদারদের বিরুদ্ধে সুসংগঠিত বিক্ষোভ ও আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করেন এবং জমিদাররা ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে কৃষকদের আরও বেশি ক্ষতিপূরণ এবং চাষাবাদের বিষয়ে তাদের আরো নিয়ন্ত্রণ প্রদানে রাজি হয় । গান্ধী সেখানে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার বহু দিনের সমর্থক ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের একত্রিত করেন ।
 গান্ধী ভারতে শিখদের তীর্থস্থান অমৃতসরে এক গণহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু করলেন ।
 পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে সাধারণ মানুষের উপরে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ১৯১৯ সালে সংগঠিত ভাবে হত্যাকাণ্ড চালায় ব্রিটিশদের গুলিতে প্রায় ৪০০ মানুষ প্রাণ হারায়, আর আহত হয় ১৩০০ মানুষ । গান্ধী তার অহিংস নীতির পরিবর্ধন করেন স্বদেশী নীতি যোগ করে । স্বদেশী নীতি মতে সকল বিদেশী পণ্য বিশেষত ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করতে হবে । তিনি ব্রিটিশ শাসকদের সাথে অসহযোগিতার ডাক দেন, যার সাথে সাথে ব্রিটিশ পণ্য বর্জনেরও কর্মসূচি পালন করেন । তাঁর অহিংস আন্দোলন-বিক্ষোভের ডাক সব শ্রেণী এবং ধর্মের মানুষের দ্বারা সাদরে সমাদৃত হয়েছিল । ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ গান্ধীকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে এনে গ্রেপ্তার করেন এবং দুই বছরের জন্য তাকে কারাবন্দী করার আদেশ দেওয়া হয় ।
 ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে মহাত্মা গান্ধী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের  নির্বাহী দায়িত্বপ্রাপ্ত হন ।  ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে আসার পর গান্ধী ভারতব্যাপী দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারী স্বাধীনতা, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ, জাতির অর্থনৈতিক সচ্ছলতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রচার শুরু করেন । তাছাড়াও তিনি অস্পৃশ্যতা, মদপান, অবজ্ঞা এবং দরিদ্রতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন । স্বরাজ পার্টি এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মাঝে বাধা দূর করতে চেষ্টা করেন ।  গান্ধী কলকাতা কংগ্রেসে ১৯২৮ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতকে ডোমিনিয়নের মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানান, অন্যথায় নতুন অহিংস নীতির পাশাপাশি পূর্ণ স্বাধীনতার হুমকি দেন । ১৯৩০ সালে গান্ধী ভারতীয়দের লবণ করের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ৪০০ কিলোমিটার বা ২৪৮ মাইল দীর্ঘ ডান্ডি লবণ আন্দোলন করেন । তাঁর সাথে হাজার হাজার ভারতীয় হেঁটে সাগরের তীরের পৌঁছান । এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তার অন্যতম সফল প্রয়াস ।

 ১৯৩১ সালে কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিতে লন্ডন সফরে যান গান্ধী । গান্ধীকে গোল টেবিল বৈঠকের জন্য লন্ডনে আমন্ত্রণ জানান হয় । সেখানে তিনি একাই কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করেন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে দেয়া, গান্ধীর আন্দোলনের লক্ষ্যগুলো বাস্তব হয়ে ওঠে । ১৯৪৭ সালে অনেক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রিয়তম দেশে স্বাধীনতা আসে ।
 মহাত্মা গান্ধী সমস্ত পরিস্থিতিতেই অহিংস মতবাদ এবং সত্যের ব্যাপারে অটল থেকেছেন   তিনি সাধারণ নিরামিষ খাবার খেতেন । শেষ জীবনে ফলমূলই বেশি খেতেন নিরামিষভোজী এর ধারণা হিন্দু ও জৈন ধর্মে গভীরভাবে বিদ্যমান । গান্ধী প্রবলভাবে বিশ্বাস করতেন যে, সামাজিক কাজে নিয়োজিত একজন ব্যক্তি অবশ্যই সাধারণ জীবন যাপন করবে । তিনি সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং একটি স্বায়ত্তশাসিত আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন । গান্ধী স্বল্প বসনের মানুষ ছিলেন । আন্তর্জাতিক বৈঠকেও তিনি এই পোশাকে উপস্থিত হতেন । নিজের পরিধেয় কাপড় তিনি নিজেই চরকায় বুনতেন তাঁর জীবনাচরণে ছিল অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে ফেলা, সাদামাটা জীবন-যাপন গ্রহণ এবং নিজের কাপড় নিজে ধোয়া । গান্ধী হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং তার সারা জীবন ধরে হিন্দু ধর্মের চর্চা করেন । হিন্দু ধর্ম থেকেই তিনি তার অধিকাংশ আদর্শ গ্রহণ করেনতিনি সকল ধর্মকে সমানভাবে বিবেচনা করতেন গান্ধী বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি ধর্মের মূলে আছে সত্য ও প্রেম

 গান্ধী পত্র-পত্রিকায় প্রচুর চিঠি লিখতেন । প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন পত্রিকায় তার চিঠি প্রকাশিত হতো গান্ধী গুজরাটি ভাষায় "ভগবত গীতা"র উপর ধারাভাষ্য লেখেন । গুজরাটি পাণ্ডুলিপিটি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন মহাদেব দাসী গান্ধীর বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে এগুলি হল - সত্যের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতার গল্প (The Story of My Experiments with Truth), দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রাম নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহ (Satyagraha in South Africa), স্বাধীকার বিষয়ে মেনিফেস্টো হিন্দি স্বরাজ ইত্যাদি । বহুমুখী লেখায় পারদর্শী মহাত্মা গান্ধী সম্পাদনা করেছেন গুজরাটি, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষার পত্রিকা হরিজন ১৯৬০ দশকে ভারত সরকার গান্ধীর রচনাবলি দ্য কালেক্টেড ওয়ার্ক অব মহাত্মা গান্ধী প্রকাশ করে । বইটি শতাধিক খণ্ডে প্রকাশিত হয় ।
 ভারত সরকার মহাত্মা গান্ধীকে ভারতের জাতির জনক হিসেবে ঘোষণা করেছে । ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহান এই নেতার মৃত্যু হয় । একটি পার্থনা সভায় যোগ দেওয়ার জন্য বেরিয়ে ছিলেন । নাথুরাম গডসে ছিলেন একজন হিন্দু মৌলবাদী, সে গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করে । শান্তির জন্য বিশ্বজুড়ে সুবিদিত এক মহান ব্যক্তিত্বের প্রয়াণে সারাবিশ্ব থেকে অসংখ্য মানুষ সমবেত হন শোক প্রকাশের জন্য । গান্ধীর ইচ্ছানুযায়ী, তার দেহ-ভস্ম বিশ্বের বেশ কয়েকটি প্রধান নদীতে ডুবানো হয় । তার দেহ-ভস্ম মহাত্মা গান্ধী বিশ্ব শান্তি সৌধে একটি হাজার বছরের পুরনো চৈনিক পাথরের পাত্রে সংরক্ষণ করা হয় ।

 আমাদের লেখা আপনার কেমন লাগছে বা আপনার যদি কোন প্রশ্ন থাকে তবে নিচে কমেন্ট করে জানান । আপনার বন্ধুদের কাছে পোস্ট টি পৌঁছেদিতে অনুগ্রহ করে শেয়ার করুণ । জীবনী বিষয়ে আরও পোস্ট পড়তে নিচে জীবনী লেখাটির উপর ক্লিক করুণ । পুরো পোস্ট টি পড়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ । আপনার ইমেল দিয়ে আমাদের ওয়েবসাইট টি সাবস্ক্রাইব করুন ।
আমাদের আরও পোস্ট - 

আপনারা দয়া করে এখানে থাকা বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের উপর ক্লিক করে জিনিস কিনুন, তাহলে আমি কিছু কমিশন পাব।

রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২০

বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার বাংলা জীবনী.


 বেগম রোকেয়া একজন অসাধারণ মহিলা । তিনি ছিলেন একজন সাহিত্যিক, শিক্ষাব্রতী, সমাজসংস্কারক এবং নারী জাগরণ ও নারীর অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ তিনি বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং প্রথম বাঙালি নারীবাদী । যার কর্ম প্রচেষ্টা বেশ গ্রহণ যোগ্য ভাবে পশ্চিমবঙ্গের মহিলা শিক্ষার অবস্থা বদলে দিয়েছিল । তাঁর পুর নাম বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন । রোকেয়া ১৮৮০ সালে রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের জন্মগ্রহণ করেছিলেন তার পিতা জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার ও মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী পিতা ও মাতার দিক থেকে বেগম রোকেয়া উচ্চবংশীয় এবং জমিদার শ্রেণীভুক্ত ছিলেন । রোকেয়ারা ছিলেন তিন বোন ও তিন ভাই ।


 তিনি ছিলেন প্রথম প্রথা ভঙ্গকারী, যিনি দরিদ্র মুসলিম মহিলাদের জন্য পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন । তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে – মহিলাদের আধুনিক শিক্ষা সমাজের অগ্রগতির জন্য অবশ্যই প্রয়োজন । তিনি পিছিয়ে পরা মহিলাদের প্রতি দয়ালু, হত দরিদ্র ও অসহায়দের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন । তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় মেয়েদের গৃহের অর্গলমুক্ত হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ ছিল না বেগম রোকেয়ার পিতা আবু আলী হায়দার সাবের আরবি, উর্দু, ফারসি, বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী হলেও মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে ছিলেন রক্ষণশীল ।
 রোকেয়ার জ্ঞানপিপাসা ছিল অসীম । রোকেয়ার বড় বোন করিমুন্নেসাও ছিলেন বিদ্যোৎসাহী ও সাহিত্যানুরাগী বেগম রোকেয়ার শিক্ষালাভ, সাহিত্যচর্চা এবং সামগ্রিক মূল্যবোধ গঠনে বড় দু’ভাই ও বোন করিমুন্নেসার যথেষ্ট অবদান ছিল । বেগম রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের ছিলেন আধুনিক মনাতিনি চাননি তাঁর বোনেরা পিছিয়ে থাকুক । তিনি রোকেয়া ও করিমুন্নেসাকে ঘরেই গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শেখান । বড় ভাই-বোনদের সমর্থন ও সহায়তায় তিনি বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি এবং আরবি ভাষা আয়ত্ত করেন । বড় ভাই ইব্রাহিম সাবেরের সহযোগিতায় গভীর রাত পর্যন্ত মোমবাতির ক্ষীণ আলোতে পড়াশোনা করেছেন
 তৎকালীন মুসলিম সমাজে ছিল কঠোর পর্দা ব্যবস্থা । বাড়ির মেয়েরা পরপুরুষ তো দূরে থাক, অনাত্মীয় নারীদের সামনেও নিজেদের চেহারা দেখাতে পারতো না । তৎকালীন সমাজব্যবস্থা অনুসারে রোকেয়া ও তাঁর বোনদের কখনোই বাড়ির বাইরে পড়াশুনা করার জন্য পাঠানো হয়নি । তিনি শিক্ষার অভাবকে নারী পশ্চাৎপদতার কারণ বলেছেন । নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করলেন, নারীকে মানুষ হিসেবে মানুষের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই শিক্ষার মাধ্যমে নারী সমাজকে আধুনিক প্রগতিশীল করাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য ।

 ১৮৯৮ সালে রোকেয়ার বিয়ে হয় বিহারের ভাগলপুর নিবাসী উর্দুভাষী সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের সঙ্গে । তিনি ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, সমাজ সচেতন, কু-সংস্কারমুক্ত এবং প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্নতাঁর সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত ঘটে স্বামীর অনুপ্রেরণায় । যার হাত ধরেই বেগম রোকেয়া পেয়েছিলেন স্বাধীনতার স্বাদ, নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করার অফুরন্ত সুযোগ । বিয়ের পর রোকেয়ার আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় পড়ালেখা পুরো দমে শুরু হয় এবং সাহিত্যচর্চার পথটা তাঁর জন্য খুলে যায় । স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায় রোকেয়া দেশি-বিদেশি লেখকদের রচনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পান এবং ক্রমশ ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন । রোকেয়ার বিবাহিত জীবন বেশিদিন স্থায়ী হয় নি । ১৯০৯ সালের ৩ মে সাখাওয়াত হোসেন মারা যান । বেগম রোকেয়া বৈধব্য জীবন বেছে নেন এবং সমাজ সেবামূলক কাজ ও সাহিত্য চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন ।
 ১৯০৯ সালে সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুর পর বেগম রোকেয়া মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লেও হাল ছাড়েননি । স্বামীর মৃত্যুর পর নিঃসঙ্গ রোকেয়া নারীশিক্ষা বিস্তার ও সমাজ সেবায় আত্মনিয়োগ করেন১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর স্বামীর প্রদত্ত অর্থে পাঁচটি ছাত্রী নিয়ে তিনি ভাগলপুরে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল স্থাপন করেন । সেটি বন্ধ হয়ে গেলে তিনি ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ কলকাতার ১৩ নং ওয়ালিউল্লাহ লেনের একটি বাড়িতে মাত্র আটজন ছাত্রী নিয়ে তিনি নব পর্যায়ে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন । সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল ১৯৩০ খ্রিঃ বেগম রোকেয়ার অক্লান্ত পরিশ্রমে একটি উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় । কলকাতায় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে পুরুষ শাসিত সমাজের সমাজপতি ও রক্ষণশীল গোঁড়াপন্থি কিছু লোক নানা বিঘ্ন সৃষ্টি করে ।  এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখার জন্য বেগম রোকেয়া তার নিজস্ব জমিদারি থেকে প্রাপ্ত আয়ের বহুলাংশ স্কুলের জন্য ব্যয় করেন ।
 ১৯১৬ সালে কলকাতায় ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ নামে একটি মহিলা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি যেখানে বিধবা নারীদের কর্মসংস্থান, দরিদ্র অসহায় বালিকাদের শিক্ষা, বিয়ের ব্যবস্থা, দুঃস্থ মহিলাদের কুটির শিল্পের প্রশিক্ষণ, নিরক্ষরদের অক্ষর জ্ঞান দান, বস্তিবাসী মহিলাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন । বেগম রোকেয়ার আত্মত্যাগ ও নিরলস প্রচেষ্টার ফলে বাংলার মুসলিম নারীজাগরণ ও মুক্তির পথ প্রশস্ত হয় । ১৯১৭ সালে ওই সংগঠনের ৫০ জন মহিলা সদস্যের উপস্থিতিতে ১৫ এপ্রিল প্রথম বার্ষিক সম্মেলন করে একটা যুগান্তকারী ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিলেন
 মুসলিম নারী সমাজে শিক্ষাবিস্তার, নারীমুক্তি ও প্রগতির আন্দোলন ছাড়াও বেগম রোকেয়া সাহিত্য ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন ।  ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ও শ্লে­ষাত্মক রচনায় রোকেয়ার স্টাইল ছিল স্বকীয় বৈশিষ্ট্য মন্ডিত । প্রবন্ধগ্রন্থে রোকেয়া নারী-পুরুষের সমকক্ষতার যুক্তি দিয়ে নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠায় আহ্বান জানিয়েছেন । ১৯০২ সালে ‘পিপাসা’ নামে একটি বাংলা গল্প লিখে সাহিত্য জগতে তার অবদান রাখা শুরু হয় । এরপর একে একে লিখে ফেলেন মতিচূর-এর প্রবন্ধগুলো এবং সুলতানার স্বপ্ন-এর মতো নারীবাদী বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ।
 তার প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গ সমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন । তিনি পুরুষতান্ত্রিক কিংবা নারী তান্ত্রিক সমাজ গড়তে চাননি । তিনি চেয়েছিলেন সমাজে নারী ও পুরুষ যাতে একসাথে সমান মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে বাঁচে । সমাজের অর্ধেক অংশকে বাদ দিলে কখনোই রাষ্ট্রের উন্নতি হবে না । তাই  তিনি ছিলেন সমতায় বিশ্বাসী । নারীশিক্ষার প্রসারে বেগম রোকেয়া আমৃত্যু কাজ করে গিয়েছেন । নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়ন, ভোটাধিকারের জন্য লড়াই শুরু করেছিলেন বেগম রোকেয়া ।

 বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাসে বেগম রোকেয়ার অবদান চিরঅম্লান হয়ে থাকবে নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং আলোর দিশারী বেগম রোকেয়ার জীবনকাল ছিল মাত্র বায়ান্ন বছর ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর মাত্র ৫২ বছর বয়সে বেগম রোকেয়া কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন । বেগম রোকেয়ার কর্ম ও আদর্শ উদযাপনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর ৯ই ডিসেম্বর রোকেয়া দিবস উদযাপন করে । বেগম রোকেয়া আজ আমাদের মাঝে নেই । কিন্তু তাঁর আদর্শ যাতে আমরা বুকে লালন করে চলতে পারি, নিজেদের কাছে আমরা সেই প্রতিজ্ঞা করবো ।
 আমাদের লেখা আপনার কেমন লাগছে বা আপনার যদি কোন প্রশ্ন থাকে তবে নিচে কমেন্ট করে জানান । আপনার বন্ধুদের কাছে পোস্ট টি পৌঁছেদিতে অনুগ্রহ করে শেয়ার করুণ । জীবনী বিষয়ে আরও পোস্ট পড়তে নিচে জীবনী লেখাটির উপর ক্লিক করুণ । পুরো পোস্ট টি পড়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ । আপনার ইমেল দিয়ে আমাদের ওয়েবসাইট টি সাবস্ক্রাইব করুন । 

আমাদের আর পোস্ট - 
শিক্ষককুলের রবি ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণানের বাংলা জীবনী.
ভারতের বীর সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দের বাংলা জীবনী.
দয়ার সাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বাংলা জীবনী .
ভারতের মিসাইল ম্যান ডঃ এ. পি. জে আব্দুল কালামের বাংলা জীবনী
বিশ্বকবি, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলা জীবনী
আপনারা দয়া করে এখানে থাকা বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের উপর ক্লিক করে জিনিস কিনুন, তাহলে আমি কিছু কমিশন পাব।