বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৯

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাংলা জীবনী .


  বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে ২৪ মে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ শাসিত ভারতে এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তাঁর বাবার নাম ফকির আহমেদ ও মায়ের নাম জাহেদা খাতুন । তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও দার্শনিক বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, দেশপ্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি চুরুলিয়া অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান জেলার আসানসোলের নিকট অবস্থিত । কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম ছিল "দুখু মিয়া" পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ  – দুই বাংলাতেই তার কবিতা  গান সমানভাবে সমাদৃত বিংশ শতাব্দীর বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম

 নজরুলের যখন দশ বছর বয়স তখন তিনি গ্রামের মক্তব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন । তাঁর পিতার মৃত্যু হলে তাকে বাধ্য হয়ে উপার্জনের চেষ্টা করতে হয় । গ্রামের মৌলবিদের সাহায্যে মক্তবে ছোটদের পড়া মুখস্থ করানোর জন্য এক পীরের দরগায় কাজের ব্যবস্থা হয় । এখানে দুই বছর তাঁর অতিবাহিত হয় । শৈশব থেকে তিনি লোকনাট্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন । এরপর তিনি ভ্রাম্যমাণ ‘লেটো’ গানের দলে যোগ দেন । সেই দলের জন্য তিনি গান গাইতেন, গান ও পালা রচনা করতেন । তিনি পালা গান রচনা করতে গিয়ে হিন্দু দেব-দেবী সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে পারেন ।
 
এরপর তিনি বাসুদেবের শখের কবি গানে যোগ দেন । এখানে তিনি গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন ও নিজে গান গেয়েছেন । সেখান থেকে তাঁকে এক বাঙালি খ্রিস্টান গার্ড বাবুর্চি কাজের জন্য নিয়ে যান । সেখানে ভাল না লাগার জন্য তিনি আসানসোলে এক চা রুটির দোকানে কাজ করতে লাগলেন । দোকানে থাকার যায়না না থাকার জন্য তিনি পাশে এক তেতলা বাড়ির সিঁড়ির নীচে থাকতেন । সেই বাড়িটি ছিল এক পুলিশ ইন্সপেক্টর কাজী রফিউল্লাহ ও তাঁর স্ত্রী শ্যামসুন্নেসার । তাঁরা নজরুলকে ময়মনসিংহ এর দরিরাম পুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন । এরপর তিনি রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন ।
 ১৯১০ সালে নজরুল বিপ্লবী নিবারণ চন্দ্র ঘটকের সাথে পরিচিত হন, যিনি তাঁর শিক্ষক ছিলেন । পরবর্তীকালে বিদ্যালয়য়ে যোগদানের সময় কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক ছিলেন তাঁর প্রধান শিক্ষক । তাঁর সান্নিধ্য নজরুলের অনুপ্রেরণার একটি উৎস১৯১৪ সালে পৃথিবীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ দেখা যায় । ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষদিকে মাধ্যমিকের প্রিটেস্ট পরীক্ষার না দিয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন সেনাদলে যোগ দিয়ে তিনি প্রথমে লাহোর, পেশোয়ার, তারপরে যান করাচীতে তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষভাগ থেকে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ অধীনস্থ ৪৯তম বেঙ্গল রেজিমেন্টে সেনা বাহিনীতে যুক্ত ছিলেন । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালে এই রেজিমেন্ট নিষিদ্ধ করা হলে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন ।
 ১৯২১ সালে কুমিল্লায় গিয়ে নার্গিস আসার খানমের সাথে তাঁর বিবাহ হয় । কিন্তু, বিবাহে ঝামেলা হওয়ার জন্য তিনি তাঁর পরিচিত সেনগুপ্তের বাড়ি চলে আসেন । পরে প্রমীলা দেবী ও নজরুল তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন গোঁড়ামি, রক্ষণশীলতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নজরুলের অবস্থান ছিল কঠোর
 
কলকাতায় এসে নজরুল ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে বসবাস শুরু করেন নজরুল রবীন্দ্রনাথ, পারস্য কবি হাফেজ ও খৈয়াম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন । এখান থেকেই নজরুলের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ শুরু হয়এই সময় ভারতীয়রা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়িয়েছিল । তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে ব্রিটিশদের নিষ্ঠুরতার প্রতিবাদ করেছিলেন । প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে তিনি গান, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি লিখতে শুরু করেন । নজরুল এ সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন এবং স্বরচিত স্বদেশী গান পরিবেশন করে পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন  ১৩২৬ বঙ্গাব্দে বঙ্গীয় মুসলমান নামক সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ প্রকাশিত হয় । এসময় তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন তিনি কুমিল্লা, মেদিনীপুর, হুগলিফরিদপুর, বাঁকুড়া এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে অংশগ্রহণ করেন
 তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে ভারতীয় যুবকদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে প্রেরণা যোগাতেন । ব্রিটিশ শাসকরা ভয় পেলেন যে – নজরুলের লেখা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্ররোচিত করবে ।
 ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে সমগ্র বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টি হয় । বিদ্রোহী কবিতার জন্য নজরুল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তাঁর কবিতা শুধু ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে প্রতীবাদ নয়, সমাজের সমস্ত রকম অসাম্য, অন্যায়, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে । তাঁর কবিতার আর একটি বিশেষত্ব হল হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের ঐতিহ্যের সার্থক মেলবন্ধন ।
 ১৯২২ সালে নজরুল ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশ করেন । ব্রিটিশরা ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় তল্লাশি চালায়, কবিকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় । এরপর তাঁকে হুগলী জেলে স্থানান্তরিত করা হয় । তিনি এখানে অনশন শুরু করেন । এক মাসের বেশি তিনি অনশন করেন । ১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে নজরুলকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয় । ১৯২৫ সালে তিনি সাপ্তাহিক ‘লাঙ্গল’ পত্রিকা প্রকাশ করেন ।
 বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর এত কবিতা, গল্প, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ আর গান কেউ লেখেন নি । ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিতনজরুলের গানের সংখ্যা চার হাজারের বেশি তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গান গুলিকে নজরুল সঙ্গীত বলা হয় । তাঁর রচিত বইগুলি হল – অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি, সাম্যবাদী, সর্বহারা, ফণীমনসা, প্রলয় শিখা ইত্যাদি । নাটক – দাতা কর্ণ, কবি কালিদাস, রক্তকমল, মহুয়া, জাহাঙ্গীর, কারাগার, সাবিত্রী, আলেয়া, সর্বহারা, সতী ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বাংলা সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার জগত্তারিণী স্বর্ণপদক নজরুলকে প্রদান করা হয় ১৯৬০ সালে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মভূষণে  ভূষিত করা হয়
  
১৯৪০ সালে কবি স্ত্রী প্রমীলা কঠিন পক্ষাঘাত হয় । কবি মানসিক যন্ত্রণায় ভেঙে পড়েন, তাঁর মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে । ১৯৪২ সালে তিনি একেবারে মূক হয়ে যান । দেশে বিভিন্ন ভাবে তাঁদের চিকিৎসা করা হয় । এখানে চিকিৎসায় সফল না হওয়ার জন্য বিদেশে লন্ডনে, ভিয়েনায় পাঠানো হয় ।  কবির স্ত্রীর মৃত্যু হয় ১৯৬২ সালে । ১৯৭১ সালে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ তৈরি হয় । ১৯৭২ সালে নজরুলকে বাংলাদেশের ঢাকাতে নিয়ে যাওয়া হয় । ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদানের সরকারী আদেশ জারী করা হয় ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন   কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করা হয় ।  বাংলাদেশে তার মৃত্যু উপলক্ষে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালিত হয় এবং ভারতের আইনসভায় কবির সম্মানে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়
 আমাদের লেখা আপনার কেমন লাগছে ও আপনার যদি কোন প্রশ্ন থাকে তবে নিচে কমেন্ট করে জানান । আপনার বন্ধুদের কাছে পোস্টটি পৌঁছে দিতে দয়া করে শেয়ার করুন । জীবনী বিষয়ে আরও পোস্ট পড়তে নিচে জীবনী লেখাটির উপর ক্লিক করুন । পুরো পোস্ট টি পড়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ 


আমাদের আরও পোস্ট পড়ুন -

আপনারা দয়া করে এখানে থাকা বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের উপর ক্লিক করে জিনিস কিনুন, তাহলে আমি কিছু কমিশন পাব।

বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯

তুরস্ক দেশের বিভিন্ন জানা অজানা কথা গুলি কি কি ?.


 তুরস্ক দেশের সরকারী নাম ‘প্রজাতন্ত্রী তুরস্ক’ । এই দেশটির বেশির ভাগ অংশ এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত হলেও কিছু অংশ ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত । ফলে ভৌগলিকভাবে দেশটি একই সাথে ইউরোপ ও এশিয়ার অন্তর্ভুক্ত । দেশটির মোট আয়তন ৭৮৩৫৬২ বর্গ কিমি । এর মধ্যে এশিয়ায় অবস্থান ৭৫৫৬৮৮ বর্গ কিমি আর ইউরোপে ২৩৭৬৪ বর্গ কিমি । আয়তন অনুসারে পৃথিবীর ৩৭ তম দেশ । জনসংখ্যার ৯০% তুরস্কের এশীয় অংশে বাস করে । বাকী ১০% ইউরোপীয় অংশে বাস করে । এশিয়া মাইনর ও দক্ষিণ পূর্ব ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তুরস্ক অবস্থিত ।

 এই দেশটি আকৃতি আয়তক্ষেত্রাকার চতুর্ভুজের মত । দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬০০ কিমি ও প্রস্থ ৮০০ কিমি । দেশটির সীমা হল – উত্তর-পূর্বে জর্জিয়া, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান প্রজাতন্ত্র নাথচিভান । দক্ষিণে সিরিয়া, ইরাক, ভূমধ্যসাগর । পূর্বে ইরান, পশ্চিমে আছে গ্রীস ও অ্যাজিয়ান সাগর ।


 ভূমধ্যসাগর ও অ্যাজিয়ান সাগর থাকার জন্য এখানকার উপকূল এলাকাতে ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু দেখা যায় । দেশের অভ্যন্তরের জলবায়ু চরমভাবাপন্ন হলেও ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু মৃদু প্রকৃতির । তুরস্কের রয়েছে বিস্তৃত উপকূল, যা দেশটির সীমান্তের তিন-চতুর্থাংশ গঠন করেছে । গ্রীষ্মকাল শুষ্ক প্রকৃতির হয় । শীতকাল হয় ঠাণ্ডা ও সিক্ত প্রকৃতির । উপকূল এলাকাতে নাতিশীতোষ্ণ সামুদ্রিক জলবায়ু দেখা যায় । এখানের মালভূমি অঞ্চলে শীতকালে তাপমাত্রা কম দেখা যায় । তুরস্কের বার্ষিক তাপমাত্রা থাকে প্রায় ২৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস । মে মাসে তুরস্কে সবথেকে বেশি বৃষ্টিপাত হয় । বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৬০ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার । জুলাই ও আগস্ট মাস তুরস্কের শুষ্কতম মাস ।
 কৃষিজ সম্পদে তুরস্ক - চেরি, ডুমুর, হ্যাজেলনাট, ডালিম উৎপাদনে পৃথিবীতে প্রথম স্থান অধিকার করে । এছাড়াও ছোলা, শসা, মরিচ, টমেটো, বেগুণ, ডাল, জলপাই, চা, আপেল, তুলো, গম, কাজুবাদাম, লেবু ইত্যাদি উৎপাদিত হয় ।

প্রাকৃতিক সম্পদ হিসাবে পাওয়া যায় – তামা, কয়লা, সোনা, আকরিক লোহা, পারদ, অ্যান্টিমনি, মার্বেল, চুনাপাথর, ম্যাগনেটাইট ইত্যাদি পাওয়া যায় । এখানকার প্রধান প্রধান শিল্পগুলি হল – খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বস্ত্র, খনিজ, কাগজ, পেট্রোলিয়াম, পর্যটন শিল্প ইত্যাদি । তুরস্কের পর্যটন শিল্প দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখে । এখানের মানুষদের প্রধান পেশা হল – চাকরি, কৃষিকাজ ইত্যাদি ।

 


 তুরস্কের দীর্ঘতম নদী হল কিজিলিরমাক, দৈর্ঘ্য ১৩৫০ কিমি । এছাড়াও প্রধান নদনদী গুলি হল – টাইগ্রিস, আরাস, ইউফেটিস, কুরা, গোদিজ, গোকসু, সেইহান ইত্যাদি । এদেশের বৃহতম হ্রদ হল লেক ভান । উচ্চতম স্থান হল মাউন্ট আরারাত । নিম্নতম স্থান ভূমধ্য সাগর ।

তুরস্কের রাজধানীর নাম আঙ্কারা, অন্যান্য প্রধান শহর হল – ইস্তাম্বুল, আদানা, কায়সেরি, বুর্শা, কেন্যো, আদাপাজরি, গাজিয়ানটেপ ইত্যাদি । ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয় তুরস্কের প্রথম প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় । বর্তমানে তুরস্কের ৭৫% জনগণ শহরে বাস করে । এদেশের বিমান বন্দরের সংখ্যা ১১৭ টি । বৃহতম বিমান বন্দর আটাটার্ক আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, সেটি ইস্তাম্বুলে অবস্থিত । 

 তুরস্ক বর্তমানে একটি আধুনিকগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র । তুরস্কের রাজনীতিতে একটি বহুদলীয় সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয় । আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং আইনসভা উভয়ের উপর রয়েছে । তুরস্ক সরকারের প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী । ৫ বছরের জন্য ভতে নির্বাচিত হয়ে সংসদে যান সংসদ সদস্যরা । ৫৫০ টি আসন নিয়ে একটি সংসদ অবস্থিত । বর্তমানকালে তুরস্ক একটি সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষ দেশ । গোটা দেশটিকে ৮১ টি প্রদেশে ভাগ করা হয়েছে । সব প্রদেশ আবার সাতটি অঞ্চলে বিভক্ত । আবার প্রতিটি প্রদেশ কতগুলি জেলা নিয়ে গঠিত । তুরস্কে মোট জেলা আছে ৯২৩টি ।  প্রদেশের রাজধানীর নাম অনুসারে প্রদেশের নাম করণ করা হয়েছে । প্রতিটি প্রদেশের কেন্দ্রীয় জেলা প্রদেশ গুলির রাজধানী । তুরস্কের জনসংখ্যা প্রায় সাত কোটি ১৫ লাখ ।  সেনানৌ ও বিমান বাহিনী নিয়ে তুরস্কের প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠিত ।  

 তুরস্ক দেশের সরকারী ভাষা হল তুর্কি । তাছাড়া অন্যান্য ভাষা হল – জাজাকি, আরবি, জর্জিয়ান ইত্যাদি । এখানে যেসব জাতীর মানুষ বসবাস করেন তাঁরা হলেন – কুরদ, লাজ, আলবেণীয়, জাজা, তাতার, আর্মেনীয়, আজারবাইজান ইত্যাদি । ধর্ম হল ইসলাম । মুদ্রার নাম লিরা । আইন সভার নাম – গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি । তুরস্কে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হচ্ছে ফুটবল । অন্যান্য খেলার মধ্যে বাস্কেটবল ও ভলিবল খেলা খুব জনপ্রিয় ।

 আমাদের লেখা আপনার কেমন লাগছে ও আপনার যদি কোন প্রশ্ন থাকে তবে নিচে কমেন্ট করে জানান । আপনার বন্ধুদের কাছে পোস্টটি পৌঁছে দিতে দয়া করে শেয়ার করুন । জানা অজানা ও ভূগোল বিষয়ে আরও পোস্ট পড়তে নিচে জানা অজানা ও ভূগোল লেখাটির উপর ক্লিক করুন । পুরো পোস্ট টি পড়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ  

 আমাদের আরও পোস্ট পড়ুন - 


আপনারা দয়া করে এখানে থাকা বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের উপর ক্লিক করে জিনিস কিনুন, তাহলে আমি কিছু কমিশন পাব।

শনিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯

ভারতের বীর সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দের বাংলা জীবনী.


ওঠো, জাগো, লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না - স্বামী বিবেকানন্দ .

 স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন দেশাত্বপ্রান, সমাজসেবী ও এক আদর্শ সন্ন্যাসী । ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১২ জানুয়ারি উত্তর কলকাতায় সিমলা অঞ্চলে বিখ্যাত দত্ত পরিবারে স্বামী বিবেকানন্দ জন্ম গ্রহণ করেন । পিতার নাম বিশ্বনাথ দত্ত ও মাতার নাম ভুবনেশ্বরী দেবী । বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন কলকাতা উচ্চ আদালতের একজন আইনজীবী । আদর করে তাঁরা বিলে বলে ডাকতেন শৈশব থেকে বিবেকানান্দ নির্ভীক, সত্যবাদী ও সহানুভূতিশীল ছিলেন । শৈশবে তিনি অত্যন্ত দুরন্ত ছিলেন, পিতামাতার পক্ষে তাকে সামলানো মাঝে মাঝেই দুঃসাধ্য হয়ে উঠত । ছাত্র হিসাবে ছিলেন খুবই মেধাবীপ্রথমে নিজ গৃহে মায়ের নিকট এবং পরে একজন গৃহশিক্ষকের নিকট নরেন্দ্রর শিক্ষাজীবন শুরু হয় । 


 তিনি তিন বছরের পাঠ্য এক বছরে পড়ে ১৮৭৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন ও প্রথম বিভাগে পাশ করেন । তিনি মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন ও স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে শিক্ষালাভ করেন । পিতার প্রগতিশীল ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও মায়ের ধর্মপ্রাণতা বিবেকানন্দের চিন্তা ও ব্যক্তিত্ব গঠনে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল । তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে আরও একটি ভাল গুন পেয়েছিলেন সেটি হল,  তিনি ভাল রান্না করতে পারতেন । স্বামী বিবেকানন্দের মধ্যে নানা গুনের সমন্বয় দেখা দিয়েছিল । সবাইকে তিনি শ্রদ্ধা করতেন, নিজের নিন্দা বা অপ্রিয় কথা বলতে তিনি কুণ্ঠিত হতেন না । সমকালীন ভারতে ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে এক সংকট পূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল । জাতীয় জীবনে এক নির্ভর যোগ্য শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল । এই রকম এক পরিস্থিতিতে দেশ পেল স্বামী বিবেকানন্দকে । অল্পকাল বয়স থেকে সমাজ সেবার প্রবণতা তাঁর মধ্যে ছিল । অশিক্ষিত, দরিদ্র, হরিজনদের সেবার জন্য তিনি ছুটে যেতেন ।

 ছোটবেলা থেকেই আধ্যাত্মিকতার প্রতি তিনি আকর্ষিত হতেন । সাধু সন্ন্যাসীদের প্রতি তাঁর আকর্ষণ অল্প বয়স থেকে ছিল । দর্শন, ধর্ম, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, শিল্পকলা ও সাহিত্য বিষয়ে বই পড়ায় তার বিশেষ আগ্রহ ছিল । তিনি রাজা রামমোহন  রায়ের বেদান্ত বিষয়ক গ্রন্থাদি পাঠ করে ব্রাহ্মসমাজের প্রতি আকৃষ্ট হন । নরেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের কথা প্রথম শোনেন জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইন্সটিটিউশনে পড়ার সময় । ১৮৮১ সালে মাত্র আঠারো বছর বয়সে দক্ষিণেশ্বরের রামকৃষ্ণ পরমহংসের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয় । প্রথম দিকে রামকৃষ্ণ তাঁর উপর প্রভাব সৃষ্টি করতে না পারলেও, কালক্রমে রামকৃষ্ণের সর্বজনীনতা, উদার নৈতিক দৃষ্টি ভঙ্গি শিক্ষার দ্বারা স্বামীজী গভীর ভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন । শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশ, বানী ও গৌতম বুদ্ধের জীবন ও বানী তাঁকে বিশেষ প্রভাবিত করেছিল । গৌতম বুদ্ধের মানব সেবা স্বামীজীকে বিশেষ ভাবে আকর্ষণ করেছিল ।

 শ্রী রামকৃষ্ণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করার পর নরেন্দ্রনাথ স্বামী বিবেকানন্দ নামে পরিচিত হন শ্রী রামকৃষ্ণের দেহ ত্যাগের পর তিনি তাঁর বানী প্রচার করতে ছয় বছর ধরে সারা ভারত পর্যটন করেন । তিনি দেশবাসীর অবর্ণনীয় দুঃখ, দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেন । তিনি উনুধাবন করলেন যে ভারত আজ দরিদ্র ও অজ্ঞানতার অন্ধকারে ডুবে আছে । ১৮৮৩ সালে কন্যাকুমারীতে স্বামীজী সিদ্ধান্ত নিলেন যে, ভারত ও ভারতবাসীর সামগ্রিক কল্যাণ করে অবহেলা, অন্ধকার দূর করে সমগ্র জাতিকে উপরে তুলে আনবেন । ভারতের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি সক্রিয় হন । দেশ ও দেশবাসীর জন্য তাঁর ভালবাসা ছিল গভীর । দেশের মানুষদের দুর্দশা মোচনের জন্য জনসেবার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেন । তিনি ভারতে নবজাগরণ আন্দোলনের এক নতুন গতি সঞ্চার করেছিলেন । দেশমাতৃকার সেবার জন্য বিবেকানন্দ যুব সমাজকে জীবন উৎসর্গ করার আহবান জানান । তাঁর স্বদেশ সেবামূলক আবেদনে ভারতের আদর্শবাদী যুব সমাজ অনুপ্রাণিত হয়েছিল,দরিদ্রের সেবার আহবানের তিনি যথাযথ সাড়া পেয়েছিলেন, তাঁর ডাকে দেশের যুব সমাজ উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের কল্যাণ কর্মে ব্রতী হয় ।  

 ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার শিকাগো ধর্ম সম্মেলনে ভারতবর্ষের মহান ঐতিহ্য এবং সনাতন হিন্দু ধর্মের আদর্শের কথা প্রচার করে স্বদেশের গৌরব  এনে দেন । যার মাধ্যমেই তিনি পাশ্চাত্য সমাজে প্রথম হিন্দুধর্ম প্রচার করেন । দি নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড তাঁকে ধর্ম সম্মেলন থেকে আবির্ভূত বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করে । তিনি বোস্টন, ডেট্রয়েট, নিউ ইয়র্ক, বাল্টিমোর, ওয়াশিংটন, ব্রুকলিন প্রভৃতি শহর থেকে বক্তৃতা করার আমন্ত্রণ লাভ করেন । বহু আমেরিকান নারী-পুরুষ তাঁর শিষ্যত্ব লাভ করেন এবং বেশ কয়েকজন তাঁর সঙ্গে ভারতে চলে আসেন । এরপর তিনি সেখান থেকে লন্ডনে যান । এই সময় তাঁর সাথে মিস মার্গারেট নোবেলের পরিচয় হয় । তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং বাকি জীবন ভারতবর্ষেই অতিবাহিত করেন । এভাবে বিভিন্ন দেশ ঘুরে তিনি ১৯০০ সালে বেলুড়ে ফিরে আসেন । ১৮৯৭ সালে তিনি ক্যাথলিক মিশনের মডেল অনুসারে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি হিন্দু ধর্মকে একটি বিশ্বধর্মে পরিণত করেন । তিনি ছিলেন ধর্ম নিরপেক্ষ চেতনা সম্পন্ন ।
 স্বামী বিবেকানন্দ সকলের জন্য প্রেম প্রীতি ভালোবাসার কথা বলে গেছেন । দরিদ্র নারায়ণ সেবার উপর তিনি জোর দিয়েছিলেন । মানবতা ও মানবসেবার মাধ্যমে সকলকে আত্ম নিয়োগ করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন । তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সব সম্ভাবনার দেশ মনে করেন ।  প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যর মধ্যে সহযোগিতা এবং মৌলিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মধ্যেই মানুষের ভবিষ্যৎ বিদ্যমান বলে তিনি উপলব্ধি করেন । তিনি পশ্চিমী সংস্কৃতির ভাল দিক গুলি সংগ্রহ করে ভারতীয় করণ করেন । দুনিয়ার যা কিছু ভাল তা সংগ্রহ করার জন্য আহ্বান করেন । ভবিষ্যৎ জাতির জন্য ক্ষতিকর সবকিছুকেই তিনি কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন ।
 জীব সেবার মধ্য দিয়ে তিনি ঈশ্বর সেবার আদর্শ খুঁজে পেয়েছিলেন  তাঁর প্রধান শিষ্যা ছিলেন মার্গারেট নোবেল । পরে তিনি ভগিনী নিবেদিতা নামে পরিচিত হন । সমাজ সেবা, শিক্ষা বিস্তার, বেদান্ত, দর্শন ইত্যাদি প্রচারের মাধ্যমে তিনি দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন । তাঁর লেখা বিখ্যাত গ্রন্থগুলি হল – বর্তমান ভারত, পরিব্রাজক, জ্ঞানযোগ, পাচ্য ও পাশ্চাত্য তার জন্মদিনটি ভারতে জাতীয় যুব দিবস হিসেবে পালিত হয় ।
 ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে ৪ জুলাই মাত্র ৩৯ বছর বয়সে এই বীর সন্ন্যাসী পরলোক গমন করেন ।

 আমাদের লেখা আপনার কেমন লাগছে ও আপনার যদি কোন প্রশ্ন থাকে তবে নিচে কমেন্ট করে জানান । আপনার বন্ধুদের কাছে পোস্টটি পৌঁছে দিতে দয়া করে শেয়ার করুন । জীবনী বিষয়ে আরও পোস্ট পড়তে নিচে জীবনী লেখাটির উপর ক্লিক করুন । পুরো পোস্ট টি পড়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ 


আমাদের আরও পোস্ট পড়ুন - 

আপনারা দয়া করে এখানে থাকা বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের উপর ক্লিক করে জিনিস কিনুন, তাহলে আমি কিছু কমিশন পাব।

মঙ্গলবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯

বাংলায় সুলতানি আমলে শিল্প-স্থাপত্য ও ভাস্কর্য কেমন ছিল ?.


দিল্লিতে সুলতানি সাম্রাজ্যের ভাঙনের ফলে ভারতে একাধিক স্বাধীন রাজ্য গড়ে উঠেছিল । সেই আঞ্চলিক রাজ্যগুলি তাদের নিজের চেষ্টায় দিল্লি সুলতানদের মত বিশাল ও ব্যাপক না হলেও, ইন্দো-ইসলামীয় স্থাপত্য ধারায় স্থাপত্য নির্মাণ করেন । ঐতিহাসিক দিক থেকে এইসব স্থাপত্য কর্মের গুরুত্ব কম নয় । স্থানীয় উপকরণ ও স্থানীয় শিল্পীদের দ্বারা এইসব স্থাপত্য গড়ে ওঠে । এইসব আঞ্চলিক স্থাপত্যে স্থানীয় স্থাপত্য রীতি ও বৈশিষ্ট্যের প্রভাব ছিল দেখার মত । ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এরকম স্থাপত্য ও শিল্পের নিদর্শন পাওয়া যায় । আমরা এখন জানবো শুধু আমাদের বাংলাদেশের (অবিভক্ত বাংলা) সুলতানি আলমের স্থাপত্য, শিল্প ও ভাস্কর্য সম্পর্কে ।

 বাংলাদেশে মুসলমান শাসকরা ছড়িয়ে পড়ে খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে । বাংলার সেই স্বাধীন ও অর্ধ স্বাধীন অঞ্চলে নানা স্থানে তাঁদের প্রশাসনিক কেন্দ্র তৈরি করেছিল । সেই সময় বাংলার স্থাপত্য নির্মাণের মূল গঠন ভঙ্গি ছিল ইসলামীয় রীতি । কাঁচামাল ও কারুকার্যে বাংলার লৌকিক রীতিও দেখা যায় । প্রধানত গৌড় ও পাণ্ডুয়াকে কেন্দ্র করে বাংলার স্থাপত্য বিকশিত হয়েছিল । সেইসব স্থাপত্যের মধ্যে বর্তমানে খুব কম টিকে আছে, আবার যেগুলি আছে তাদের অবস্থা ভগ্ন ও জরাজীর্ণ । এখানে ইটের ব্যবহার করা হত । বাড়ি ও মন্দির গুলির চাল ঢালু করা হত, কারণ বৃষ্টির জল সহজে দাঁড়াতে না পারে । এই নির্মাণ পদ্ধতিকে বলা হয় বাংলা । পুরনো মন্দির গুলি একই ধাঁচে তৈরি করা । পরপর দুটি কাঠামোকে পাশাপাশি জুড়ে তৈরি করা হলে তাকে বলা হত জোড়-বাংলা ।

 এই সময় মন্দির গুলি বেশির ভাগ দেওয়াল গুলিতে টেরাকোটা বা পোড়ামাটির কাজ করা হত । এগুলি এখন বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর ও বাংলার নানা স্থানে দেখতে পাওয়া যায় । আয়তক্ষেত্রাকার কাঠামোর উপরে অনেক গুলি চুড়া ব্যবহার করে মন্দির বানানো হত, সেগুলিকে চুড়া বলা হয় । একটি চুড়া থাকলে এক রত্ন, আবার পাঁচটি চুড়া থাকলে তাকে বলা হয় পঞ্চরত্ন মন্দির । এসময় আবার চাল বা চালা ভিত্তিক মন্দির বানানোর রীতি ছিল । মন্দিরের মাথায় চালার সংখ্যা হিসাবে এগুলিকে বলা হত একচালা, দো-চালা ইত্যাদি ।

 এই সময়ের বাংলার স্থাপত্য শিল্পকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে । প্রথম পর্যায় ছিল ১২০২ থেকে ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত । সেসব স্থাপত্য অধিকাংশ রাজধানী গৌড়কে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল । এই সময় ইট ও পাথর দিয়ে গম্বুজাকৃতি মসজিদ তৈরি হয় । মসজিদ গুলিতে টেরাকোটা বা পোড়ামাটির অলংকরণ ছিল । এগুলির কোন কার্নিশ ছিল না । এই পর্বের ইমারত গুলি ত্রিবেণী, পাণ্ডুয়া, সপ্তগ্রাম স্থান গুলিতে নির্মিত হয় । ত্রিবেণীতে জাফর খানের সমাধির ভগ্নাবশেষ ও বসিরহাটে ছড়িয়ে থাকা কিছু স্তূপ ছাড়া সেই সময়ের স্থাপত্য আজ টিকে নেই ।
আরো পড়ুন-
 দ্বিতীয় পর্বের সময়কাল হিসাবে ধরা হয় ১৩৪০ থেকে ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত । সেই সময় স্থাপত্যকর্ম পাণ্ডুয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল । দ্বিতীয় পর্বের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল মালদহের পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ । সুলতান সিকন্দর শাহ ১৩৬৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁর নতুন রাজধানী পাণ্ডুয়াতে এই মসজিদ নির্মাণ করেন । দামাস্কাসের আদি মসজিদের সাথে আদিনা মসজিদের সীমানা প্রায় সমান । এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ৪০০ ফুট ও ১৩০ ফুট । মসজিদের উপরের অংশের খিলান ও গম্বুজ প্রধানত ইট দিয়ে তৈরি হয়েছিল । 

  অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে – মুসলিম স্থাপত্যের প্রথম পর্যায়ের উপকরণ গুলি হিন্দু স্থাপত্য থেকে নেওয়া হয়েছে । আদিনা মসজিদের সামনের উপ কাঠামো নির্মাণের পাথর বা দেওয়ালের অভ্যন্তরে খোদাই করা পাথর, মূর্তি ইত্যাদি অন্য কোন স্থাপত্য থেকে নেওয়া হয়েছে । মনে করা হয় যে – এগুলি লক্ষণাবতী বা তার কাছাকাছি কোন হিন্দু স্থাপত্য বা অট্টালিকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে । আদিনা মসজিদের গাম্ভীর্য ও শিল্পচর্চায় রাজকীয় মর্যাদার উন্নত একটি শিল্প সৃষ্টি হিসাবে স্বীকার করা হয়েছে ।


 বাংলার সুলতানি স্থাপত্যের তৃতীয় পর্বের সময়কাল হিসাবে ধরা হয় ১৪৪২ থেকে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত । তৃতীয় পর্বে বাংলায় ইন্দো-ইসলামিয় স্থাপত্য শিল্প সবথেকে উন্নত হয়েছিল । এই সময় নতুন স্থাপত্য ধারা দেখা যায় । বাংলার আদ্র জলবায়ুর উপযোগী স্থাপত্যের উপর জোর দেওয়া হয় । এই সময় ছাদের জল তাড়াতাড়ি সরানোর জন্য ছাদ ঢালু ও বক্র করা হয় । তৃতীয় পর্বের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য হল – একলাখি সমাধি, দাখিল দরওয়াজা, তাঁতিপাড়া মসজিদ, ছোটো সোনা মসজিদ, বড়োসোনা মসজিদ, কদম রসুলের মসজিদ ইত্যাদি ।

তৃতীয় ধারায় প্রথম প্রকাশ দেখা যায় পাণ্ডুয়ায় সুলতান জালালউদ্দিন মহম্মদ শাহ (যদু) একলাখি স্মৃতি সৌধ । এই মসজিদের টেরাকোটার কাজ ও অর্ধ গোলক আকৃতি অন্যতম আকর্ষণীয় । এর চুড়া অষ্টভুজাকৃতি, যা দূর থেকে দেখলে মনে হবে এটি হয়তো দ্বিতল । এটি নির্মিত হয় ১৪২৫ সালে । গৌড়ের দাখিল দরওয়াজা সে সময়ের আরও একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য । ১৪৬৫ সালে সুলতান বারবক শাহ এটি নির্মাণ করেছিলেন । এটি একটি বিজয় তোরণ হিসাবে গৌড় দুর্গের উত্তর প্রাকারের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ।

 গৌড়ের তাঁতিপাড়া মসজিদটি ১৪৮০ সালে তৈরি হয় । নির্মাণ শৈলী স্থায়িত্বের দিক থেকে এটি দাখিল দরওয়াজা থেকে অনেক উন্নত । আলাউদ্দিন হুসেন শাহের আমলে নির্মাণ করা হয় ছোটো সোনা মসজিদ । ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হয় । গৌড়ের মধ্যে সবথেকে বড়ো মসজিদ হল বড়োসোনা মসজিদ । এই মসজিদে উজ্জ্বল মিনাকরা বহু বর্ণের টালি ব্যবহার করা হয়েছে । জন মার্শালের মতে – এই মসজিদের নকসা দ্রাবিড় স্থাপত্যের অনুরূপ ।

 
আমাদের লেখা আপনার কেমন লাগছে ও আপনার যদি কোন প্রশ্ন থাকে তবে নিচে কমেন্ট করে জানান । আপনার বন্ধুদের কাছে পোস্টটি পৌঁছে দিতে দয়া করে শেয়ার করুন । ইতিহাস বিষয়ে আরও পোস্ট পড়তে নিচে ইতিহাস লেখাটির উপর ক্লিক করুন । পুরো পোস্ট টি পড়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ 
আমাদের আরও পোস্ট পড়ুন -

আপনারা দয়া করে এখানে থাকা বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের উপর ক্লিক করে জিনিস কিনুন, তাহলে আমি কিছু কমিশন পাব।